1. admin@kagojerbarta.com : admin :
  2. kamrul304076@gmail.com : Kamrul :
  3. jamalpurbakshiganj@gmail.com : Kamrulbk :
  4. seyam2858@gmail.com : seyam :
ঢাকা ০৮:০৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২৬, ২৯ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বর্ষাকালেও লামায় পাহাড় কাটা বন্ধ নেই, বাড়ছে ভূমিধসের শঙ্কা

বিশেষ প্রতিনিধি
সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি
৩১

বর্ষা এলেই পাহাড়ি জনপদে বাড়ে ভূমিধসের শঙ্কা। অথচ সেই ঝুঁকিপূর্ণ সময়েই বান্দরবানের লামা উপজেলায় পাহাড় কাটার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, পরিবেশের ভারসাম্য ও পাহাড়ি জনপদের নিরাপত্তার বিষয়টি উপেক্ষা করে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় এক্সকাভেটর (বেকু) দিয়ে প্রকাশ্যে পাহাড় কেটে মাটি সংগ্রহ করা হচ্ছে। পরে এসব মাটি সরবরাহ করা হচ্ছে স্থানীয় ইটভাটাগুলোতে।
সরেজমিন অনুসন্ধান ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, লামার বিভিন্ন ইউনিয়নে ইটভাটার মাটির চাহিদা মেটাতে পাহাড় ও টিলা কেটে মাটি সংগ্রহের প্রবণতা রয়েছে। বিশেষ করে ফাইতং ইউনিয়নকে ঘিরে পাহাড় কাটার অভিযোগ সবচেয়ে বেশি। স্থানীয়দের দাবি, ইউনিয়নটিতে ৩৩টিরও বেশি ইটভাটা রয়েছে। উপজেলার ফাঁসিয়াখালী, গজালিয়া, সরই ও লামা পৌর এলাকাতেও রয়েছে একাধিক ইটভাটা।
ইটভাটার মাটির চাহিদাই কি পাহাড় কাটার প্রধান কারণ?
স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, লামা উপজেলায় অন্তত ৪০টি ইটভাটা রয়েছে। এসব ভাটায় ইট তৈরির জন্য বিপুল পরিমাণ মাটির প্রয়োজন হয়। অভিযোগ রয়েছে, সেই চাহিদার একটি অংশ পূরণ করা হচ্ছে পাহাড় কেটে সংগৃহীত মাটি দিয়ে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কোথাও পাহাড়ের ঢাল কেটে সমতল করা হয়েছে, আবার কোথাও পাহাড়ের নিচের অংশ কেটে মাটি সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। কয়েকটি স্থানে কেটে রাখা মাটির বড় বড় স্তূপও দেখা গেছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
তবে কোন কোন ইটভাটায় এসব মাটি সরবরাহ করা হচ্ছে, সংশ্লিষ্ট মাটি কাটার সঙ্গে কারা জড়িত এবং তাদের বৈধ অনুমোদন রয়েছে কি না—এসব বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তথ্য যাচাই প্রয়োজন।
বর্ষায় ঝুঁকি আরও ভয়াবহ
পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, পাহাড়ের প্রাকৃতিক ঢাল ও মাটির স্তর কেটে ফেলার ফলে পাহাড়ের স্থিতিশীলতা নষ্ট হতে পারে। বর্ষাকালে টানা বৃষ্টিতে কাটা অংশের মাটি পানিতে সিক্ত হয়ে দুর্বল হয়ে পড়লে আকস্মিক ধসের আশঙ্কা তৈরি হয়।
লামার পাহাড়ি এলাকায় বসতি, কৃষিজমি ও বিভিন্ন সড়কের পাশে এ ধরনের পাহাড় কাটার ঘটনা ঘটলে অতিবৃষ্টির সময় মাটি ও পাথর ধসে পড়ার ঝুঁকি আরও বেড়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা স্থানীয়দের।
স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা বলেন, “বর্ষার সময় পাহাড় কাটা আরও বিপজ্জনক। প্রশাসন অভিযান চালানোর পরও যদি আবার একইভাবে বেকু দিয়ে পাহাড় কাটা হয়, তাহলে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আগে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।”
পরিবেশ অধিদপ্তরের অভিযান, তবু প্রশ্ন নজরদারি নিয়ে
পাহাড় কাটা ও অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর কথা জানিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর। বান্দরবান পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক নুরুল হাসান সজীব জানান, তিনি যোগদানের পর গত তিন মাসে অবৈধ ইটভাটা ও পাহাড় কাটার অপরাধে ২৬ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ আদায় করা হয়েছে। একই সময়ে পাঁচটি মোবাইল কোর্ট পরিচালনার কথাও জানান তিনি।
তিনি বলেন, “অবৈধ ইটভাটা ও পাহাড় কাটার বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান ও আইনগত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।”
তবে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—অভিযান ও জরিমানার পরও যদি একই এলাকায় আবার পাহাড় কাটার ঘটনা ঘটে, তাহলে এসব কর্মকাণ্ডের নেপথ্যে কারা রয়েছে এবং কীভাবে তারা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে?
শুধু অভিযান নয়, প্রয়োজন ধারাবাহিক নজরদারি
পরিবেশকর্মী ও সাংবাদিক রুহুল আমিন বলেন, “ইটভাটার মাটির জোগান দিতে পাহাড় কেটে ফেলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। পাহাড় ধ্বংস হলে এর প্রভাব শুধু পরিবেশের ওপর পড়ে না, মানুষের জীবন ও জীবিকাও ঝুঁকিতে পড়ে। তাই অবৈধ পাহাড় কাটা বন্ধে প্রশাসনের কার্যকর ও ধারাবাহিক নজরদারি প্রয়োজন।”
সচেতন মহলের মতে, পাহাড় কাটার অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে শুধু মাটি কাটার শ্রমিক বা যন্ত্র জব্দ করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। মাটি কোথা থেকে আসছে, কোথায় যাচ্ছে, কোন ইটভাটায় ব্যবহার হচ্ছে এবং এর সঙ্গে কারা জড়িত—পুরো সরবরাহব্যবস্থাকে তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ইটভাটাগুলোর পরিবেশগত ছাড়পত্র, অনুমোদন ও মাটি সংগ্রহের বৈধ উৎস যাচাইয়ের দাবিও উঠেছে।
বর্ষার এই সময়ে পাহাড় কাটা অব্যাহত থাকলে সম্ভাব্য ভূমিধসের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। তাই বড় কোনো দুর্ঘটনা বা প্রাণহানির ঘটনা ঘটার আগেই প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :
  • আপডেট সময় : ১২:৪১:৪০ অপরাহ্ণ, বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ২০২৬ ১৬ বার পড়া হয়েছে

বর্ষাকালেও লামায় পাহাড় কাটা বন্ধ নেই, বাড়ছে ভূমিধসের শঙ্কা

আপডেট সময় : ১২:৪১:৪০ অপরাহ্ণ, বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ২০২৬
৩১

বর্ষা এলেই পাহাড়ি জনপদে বাড়ে ভূমিধসের শঙ্কা। অথচ সেই ঝুঁকিপূর্ণ সময়েই বান্দরবানের লামা উপজেলায় পাহাড় কাটার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, পরিবেশের ভারসাম্য ও পাহাড়ি জনপদের নিরাপত্তার বিষয়টি উপেক্ষা করে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় এক্সকাভেটর (বেকু) দিয়ে প্রকাশ্যে পাহাড় কেটে মাটি সংগ্রহ করা হচ্ছে। পরে এসব মাটি সরবরাহ করা হচ্ছে স্থানীয় ইটভাটাগুলোতে।
সরেজমিন অনুসন্ধান ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, লামার বিভিন্ন ইউনিয়নে ইটভাটার মাটির চাহিদা মেটাতে পাহাড় ও টিলা কেটে মাটি সংগ্রহের প্রবণতা রয়েছে। বিশেষ করে ফাইতং ইউনিয়নকে ঘিরে পাহাড় কাটার অভিযোগ সবচেয়ে বেশি। স্থানীয়দের দাবি, ইউনিয়নটিতে ৩৩টিরও বেশি ইটভাটা রয়েছে। উপজেলার ফাঁসিয়াখালী, গজালিয়া, সরই ও লামা পৌর এলাকাতেও রয়েছে একাধিক ইটভাটা।
ইটভাটার মাটির চাহিদাই কি পাহাড় কাটার প্রধান কারণ?
স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, লামা উপজেলায় অন্তত ৪০টি ইটভাটা রয়েছে। এসব ভাটায় ইট তৈরির জন্য বিপুল পরিমাণ মাটির প্রয়োজন হয়। অভিযোগ রয়েছে, সেই চাহিদার একটি অংশ পূরণ করা হচ্ছে পাহাড় কেটে সংগৃহীত মাটি দিয়ে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কোথাও পাহাড়ের ঢাল কেটে সমতল করা হয়েছে, আবার কোথাও পাহাড়ের নিচের অংশ কেটে মাটি সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। কয়েকটি স্থানে কেটে রাখা মাটির বড় বড় স্তূপও দেখা গেছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
তবে কোন কোন ইটভাটায় এসব মাটি সরবরাহ করা হচ্ছে, সংশ্লিষ্ট মাটি কাটার সঙ্গে কারা জড়িত এবং তাদের বৈধ অনুমোদন রয়েছে কি না—এসব বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তথ্য যাচাই প্রয়োজন।
বর্ষায় ঝুঁকি আরও ভয়াবহ
পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, পাহাড়ের প্রাকৃতিক ঢাল ও মাটির স্তর কেটে ফেলার ফলে পাহাড়ের স্থিতিশীলতা নষ্ট হতে পারে। বর্ষাকালে টানা বৃষ্টিতে কাটা অংশের মাটি পানিতে সিক্ত হয়ে দুর্বল হয়ে পড়লে আকস্মিক ধসের আশঙ্কা তৈরি হয়।
লামার পাহাড়ি এলাকায় বসতি, কৃষিজমি ও বিভিন্ন সড়কের পাশে এ ধরনের পাহাড় কাটার ঘটনা ঘটলে অতিবৃষ্টির সময় মাটি ও পাথর ধসে পড়ার ঝুঁকি আরও বেড়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা স্থানীয়দের।
স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা বলেন, “বর্ষার সময় পাহাড় কাটা আরও বিপজ্জনক। প্রশাসন অভিযান চালানোর পরও যদি আবার একইভাবে বেকু দিয়ে পাহাড় কাটা হয়, তাহলে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আগে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।”
পরিবেশ অধিদপ্তরের অভিযান, তবু প্রশ্ন নজরদারি নিয়ে
পাহাড় কাটা ও অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর কথা জানিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর। বান্দরবান পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক নুরুল হাসান সজীব জানান, তিনি যোগদানের পর গত তিন মাসে অবৈধ ইটভাটা ও পাহাড় কাটার অপরাধে ২৬ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ আদায় করা হয়েছে। একই সময়ে পাঁচটি মোবাইল কোর্ট পরিচালনার কথাও জানান তিনি।
তিনি বলেন, “অবৈধ ইটভাটা ও পাহাড় কাটার বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান ও আইনগত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।”
তবে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—অভিযান ও জরিমানার পরও যদি একই এলাকায় আবার পাহাড় কাটার ঘটনা ঘটে, তাহলে এসব কর্মকাণ্ডের নেপথ্যে কারা রয়েছে এবং কীভাবে তারা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে?
শুধু অভিযান নয়, প্রয়োজন ধারাবাহিক নজরদারি
পরিবেশকর্মী ও সাংবাদিক রুহুল আমিন বলেন, “ইটভাটার মাটির জোগান দিতে পাহাড় কেটে ফেলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। পাহাড় ধ্বংস হলে এর প্রভাব শুধু পরিবেশের ওপর পড়ে না, মানুষের জীবন ও জীবিকাও ঝুঁকিতে পড়ে। তাই অবৈধ পাহাড় কাটা বন্ধে প্রশাসনের কার্যকর ও ধারাবাহিক নজরদারি প্রয়োজন।”
সচেতন মহলের মতে, পাহাড় কাটার অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে শুধু মাটি কাটার শ্রমিক বা যন্ত্র জব্দ করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। মাটি কোথা থেকে আসছে, কোথায় যাচ্ছে, কোন ইটভাটায় ব্যবহার হচ্ছে এবং এর সঙ্গে কারা জড়িত—পুরো সরবরাহব্যবস্থাকে তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ইটভাটাগুলোর পরিবেশগত ছাড়পত্র, অনুমোদন ও মাটি সংগ্রহের বৈধ উৎস যাচাইয়ের দাবিও উঠেছে।
বর্ষার এই সময়ে পাহাড় কাটা অব্যাহত থাকলে সম্ভাব্য ভূমিধসের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। তাই বড় কোনো দুর্ঘটনা বা প্রাণহানির ঘটনা ঘটার আগেই প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।