পুলিশের সহযোগিতায় বাকলিয়ায় উসমান-সেলিমের ‘মাদকের হাট’
চট্টগ্রামের বাকলিয়ায় রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে মাদক কারবার বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে উসমান ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে। স্থানীয়দের দাবি, কালামিয়া বাজার, বাস্তহারা, কল্পলোক আবাসিক, নোমান কলেজ রোড, তুলাতলী ও ৫ নম্বর ব্রিজ এক্সেস রোডসহ বিভিন্ন এলাকায় সক্রিয় রয়েছে তাদের মাদকচক্র। এ চক্রের অন্যতম সহযোগী হিসেবে সেলিমের নামও উঠে এসেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, রাত হলেই মোটরসাইকেল, লাল রঙের প্রাইভেট কার ও সিএনজিচালিত অটোরিকশায় বিভিন্ন এলাকা থেকে মাদক এনে বাকলিয়ার অলিগলিতে সরবরাহ করা হয়। উসমান ও তার সহযোগীদের নিয়ন্ত্রণে একাধিক ছোট গ্রুপ এ কাজে জড়িত বলেও অভিযোগ রয়েছে।
মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে কথা বললে মামলা ও হয়রানির ভয় দেখানোর অভিযোগও করেছেন স্থানীয়রা। এমনকি নারী সদস্যদের ব্যবহার করে হয়রানির অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
মাদক কারবারের পাশাপাশি বাকলিয়া থানার কয়েকজন পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধেও গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয়রা। তাদের দাবি, মাসোহারা বা আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে মাদক কারবারিদের কেউ কেউ পুলিশের সহযোগিতা পাচ্ছেন। এ কারণেই প্রকাশ্য অভিযোগ থাকার পরও তারা বারবার গ্রেপ্তার এড়িয়ে যাচ্ছে।
কালামিয়া বাজারের বাসিন্দা মোবারক বলেন, ‘উসমান মাদক কারবারি এটা এলাকায় অনেকেরই জানা। আগে মাদক কারবারিরা আটক হতো। এখন রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে এসব করছে। পুলিশের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক না থাকলে প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি করে কীভাবে গ্রেপ্তার এড়ায়—এটাই প্রশ্ন।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির এক নেতা বলেন, ‘দলের নাম ব্যবহার করে কেউ মাদক ব্যবসা করলে তার দায় দল নেবে না। রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে অপরাধ করলে তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।’
পুলিশের নথি অনুযায়ী, উসমানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলা রয়েছে। এর মধ্যে সিএমপির বাকলিয়া থানার এফআইআর নং-২১, তারিখ ১৬ এপ্রিল ২০১৯, জিআর নং-১৫০, ধারা ৩৬(১) সারণির ১০(ক), মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১৮। এছাড়া বাকলিয়া থানার এফআইআর নং-২, তারিখ ১ সেপ্টেম্বর ২০১৮, জিআর নং-৩৭২, ধারা ১৯(১) এর ৯(খ), ১৯৯০ সালের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন এবং বাকলিয়া থানার এফআইআর নং-৩১, তারিখ ২১ অক্টোবর ২০১৪, দণ্ডবিধির ২৫/২৬/৩০৭/৫৪/৩৮৫/৩৯২/৩৪ ধারায় তার নাম আসামি হিসেবে রয়েছে বলে নথিতে উল্লেখ আছে। এছাড়া কোতোয়ালী, ফেনী সদর ও শ্রীমঙ্গল থানায়ও তার বিরুদ্ধে মামলা থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।
সেলিমের বিরুদ্ধে সিএমপির বাকলিয়া থানার এফআইআর নং-১০, তারিখ ৬ অক্টোবর ২০১৭, জিআর নং-০৬৯, ধারা ১৯(১) এর ৯(খ), ১৯৬০ সালের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন এবং একই থানার এফআইআর নং-৭, তারিখ ৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, জিআর নং-৪৯/১৭, একই আইনের ধারায় মামলা থাকার তথ্য রয়েছে। এছাড়া নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও থানার এফআইআর নং-৪৭, তারিখ ২৭ আগস্ট ২০১৬, আইনশৃঙ্খলা বিঘ্নকারী অপরাধ (দ্রুত বিচার) আইন, ২০০২-এর সংশ্লিষ্ট ধারায় তার নাম রয়েছে বলে নথিতে উল্লেখ আছে। কোতোয়ালী থানাসহ আরও কয়েকটি মামলায় তার নাম থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।এবিষয়ে জানতে চাইলে সেলিম বলেন,’আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে নিউজ করে দেন আপনি।’
মাদকের মূলহোতাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। ৭ আগস্ট কক্সবাজারে আইনশৃঙ্খলা ও মাদকবিরোধী সভা শেষে তিনি জানান, শীর্ষ মাদক কারবারিদের একটি নির্মোহ তালিকা তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। টাস্কফোর্সের মাধ্যমে তালিকা চূড়ান্ত করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মাদক পাচারের রুট চিহ্নিত করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর স্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন এবং স্থল ও জলপথে নজরদারি বাড়ানোর কথাও জানান তিনি।
সরকার যখন মাদকের মূলহোতাদের শনাক্ত করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলছে, তখন বাকলিয়ায় রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে মাদক কারবারের অভিযোগ এবং পুলিশের কথিত সহযোগিতার বিষয়টি নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে স্থানীয়দের মধ্যে।
পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে মাদক কারবারিদের সহযোগিতা ও মাসোহারা নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে সিএমপির এক কর্মকর্তা বলেন, ‘অভিযোগগুলো যাচাই করে দেখা হবে। কোনো পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
বাকলিয়া থানার ওসির সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।

























