1. admin@kagojerbarta.com : admin :
  2. amirsadeky88@gmail.com : amirsadeky :
  3. faysalajony@gmail.com : FAYSAL AHMED :
  4. kamrul304076@gmail.com : Kamrul :
  5. jamalpurbakshiganj@gmail.com : Kamrulbk :
  6. motin.imran07051986@gmail.com : motin.imran07051986@gmail.com :
  7. seyam2858@gmail.com : seyam :
ঢাকা ০৬:৫০ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৩০ অগাস্ট ২০২৬, ১৫ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রাজশাহীতে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়ায় বেড়েছে খাবার পানির সংকট

নিজস্ব প্রতিবেদক:
সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি
১০

পাশ দিয়ে বয়ে গেছে পদ্মা নদী, তবু রাজশাহীর বিভিন্ন এলাকায় দেখা দিয়েছে খাবার পানির সংকট। বরেন্দ্র অঞ্চলে ক্রমাগত ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়ায় কোথাও নলকূপে পানি উঠছে না, আবার কোথাও সেচের গভীর নলকূপও অচল হয়ে পড়ছে। ফলে পদ্মার তীরের রাজশাহীতে পানিসংকট এখন আর কেবল মৌসুমি সমস্যা নয়; এটি ধীরে ধীরে দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত ও ব্যবস্থাপনাগত সংকটে রূপ নিচ্ছে।

অন্যদিকে রংপুর অঞ্চলে চলতি আগস্টে স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কম বৃষ্টিপাত হওয়ায় আমনের খেতগুলোতে দেখা দিয়েছে পানির সংকট। বৃষ্টির অপেক্ষায় থাকা কৃষকদের এখন বাড়তি খরচ করে ভূগর্ভস্থ পানি তুলে সেচ দিতে হচ্ছে।

রাজশাহী ওয়াসার তথ্য অনুযায়ী, মহানগরীর পানি সরবরাহব্যবস্থা এখনো বড় অংশে ভূগর্ভস্থ পানিনির্ভর। ওয়াসার ওয়েবসাইটে নগরীতে দৈনিক পানির চাহিদা ১১৩ দশমিক ২৯ মিলিয়ন লিটার এবং উৎপাদন ৯৫ মিলিয়ন লিটার উল্লেখ করা হয়েছে। সরবরাহব্যবস্থার আওতায় রয়েছে মহানগরীর প্রায় ৮৪ শতাংশ মানুষ।

ওয়াসা জানিয়েছে, ভূগর্ভস্থ পানিতে আয়রন, ম্যাঙ্গানিজ ও হার্ডনেস তুলনামূলক বেশি। এ কারণে ভবিষ্যতে ভূ-উপরিস্থ পানি শোধন করে নগরবাসীকে সরবরাহের দিকে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ও নদী গবেষক অধ্যাপক চৌধুরী সারওয়ার জাহান বলেন, রাজশাহীর পানিসংকটের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য হলো—মহানগরীর পাশেই পদ্মা নদী থাকলেও নগরবাসীর পানির বড় অংশ আসে মাটির নিচ থেকে। নদীর পানি ব্যবহার করতে হলে তা সংগ্রহ, শোধন, জীবাণুমুক্তকরণ, সংরক্ষণ এবং বড় পাইপলাইন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সরবরাহ করতে হয়। অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে দীর্ঘদিন ধরে পদ্মার পানি শোধন করে নগরবাসীকে দেওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও এর বাস্তবায়ন ধীরগতির।

২০২১ সালের এক প্রতিবেদনে রাজশাহী ওয়াসা জানিয়েছিল, দৈনিক প্রায় ১৩ কোটি ৫০ লাখ লিটার চাহিদার বিপরীতে উৎপাদন ছিল ৯ কোটি ৯০ লাখ লিটার। উৎপাদিত পানির প্রায় ৯০ শতাংশই আসত ভূগর্ভস্থ উৎস থেকে। একই সময়ে পদ্মার পানি শোধনের মাধ্যমে সরবরাহ বাড়ানোর পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছিল।

বরেন্দ্র অঞ্চলের পানির অবস্থা নিয়ে গবেষণা করা অধ্যাপক চৌধুরী সারওয়ার জাহান বলেন, মহানগরীর বাইরে রাজশাহীর বরেন্দ্র অঞ্চলের পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। গোদাগাড়ী, তানোরসহ বিভিন্ন এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমাগত নিচে নামছে। গবেষণাভিত্তিক আলোচনায় দেখা গেছে, গোদাগাড়ী, তানোর ও নওগাঁর নিয়ামতপুরে প্রতি মাসে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর শূন্য দশমিক ০০৪ থেকে শূন্য দশমিক ০২৮ হারে নিম্নমুখী হচ্ছে। এতে বোঝা যায়, ভূগর্ভে পুনর্ভরণের তুলনায় পানি উত্তোলনের পরিমাণ বেশি।

গবেষকদের মতে, নির্বিচারে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের ফলে পানিধারক স্তর বা অ্যাকুইফারের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। শুষ্ক মৌসুমে সেচনির্ভর কৃষিতে বিপুল পরিমাণ ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করা হলেও সেই অনুপাতে বৃষ্টির পানি মাটির নিচে ফিরে যাচ্ছে না।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি ও কৃষিতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক গিয়াস উদ্দিন বলেন, বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষিব্যবস্থার সঙ্গে পানির সংকট সরাসরি যুক্ত। ভূ-পৃষ্ঠের পানি সংরক্ষণ, কৃত্রিমভাবে ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ, দক্ষ সেচব্যবস্থা এবং ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমানোর ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন।

রংপুরে বৃষ্টির অভাবে আমন নিয়ে শঙ্কা

এদিকে রংপুরে স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কম বৃষ্টিপাত হওয়ায় আমন চাষে দেখা দিয়েছে পানির সংকট। আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি আগস্টে রংপুরে ৪০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত হওয়ার কথা থাকলেও ২২ আগস্ট পর্যন্ত বৃষ্টি হয়েছে প্রায় ১০০ মিলিমিটার।

ফলে প্রকৃতিনির্ভর আমন চাষিরা এখন জমিতে ভূগর্ভস্থ পানি তুলে সেচ দিতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে উৎপাদন খরচও বেড়ে যাচ্ছে। কৃষকদের হিসাবে, একরপ্রতি সেচ দিতে খরচ হচ্ছে ৮ হাজার টাকার বেশি।

রংপুর বিভাগে এবার প্রায় ১১ লাখ হেক্টর জমিতে আমন চাষ হয়েছে। রংপুর মহানগরের খাসবাগ এলাকার আমন চাষি আসাদুজ্জামান আফজাল বলেন, বর্তমানে আমন ধানের বয়স দুই থেকে আড়াই মাস। এরই মধ্যে চারবার সেচ দিতে হয়েছে। প্রতি দোন (২৪ শতক) জমিতে প্রতি ঘণ্টা সেচ দিতে খরচ হচ্ছে ১২০ টাকা। চার দফায় ২২ থেকে ২৫ ঘণ্টা সেচ দিতে গিয়ে তাঁর খরচ হয়েছে ২ হাজার টাকার বেশি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজশাহীতে দীর্ঘমেয়াদে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমানো এবং রংপুরে বৃষ্টিনির্ভর কৃষির পাশাপাশি পানি ব্যবস্থাপনা জোরদার করা জরুরি। তা না হলে একদিকে পানির স্তর আরও নিচে নামবে, অন্যদিকে অনাবৃষ্টির সময় কৃষকের উৎপাদন খরচ বাড়তে থাকবে। দেশের উত্তরাঞ্চলে পানি ব্যবস্থাপনায় এখনই সমন্বিত ও টেকসই পরিকল্পনা নেওয়া প্রয়োজন।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :
  • আপডেট সময় : ০১:৫৬:৫৭ পূর্বাহ্ণ, রবিবার, ২৩ আগস্ট ২০২৬ ৮ বার পড়া হয়েছে

রাজশাহীতে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়ায় বেড়েছে খাবার পানির সংকট

আপডেট সময় : ০১:৫৬:৫৭ পূর্বাহ্ণ, রবিবার, ২৩ আগস্ট ২০২৬
১০

পাশ দিয়ে বয়ে গেছে পদ্মা নদী, তবু রাজশাহীর বিভিন্ন এলাকায় দেখা দিয়েছে খাবার পানির সংকট। বরেন্দ্র অঞ্চলে ক্রমাগত ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়ায় কোথাও নলকূপে পানি উঠছে না, আবার কোথাও সেচের গভীর নলকূপও অচল হয়ে পড়ছে। ফলে পদ্মার তীরের রাজশাহীতে পানিসংকট এখন আর কেবল মৌসুমি সমস্যা নয়; এটি ধীরে ধীরে দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত ও ব্যবস্থাপনাগত সংকটে রূপ নিচ্ছে।

অন্যদিকে রংপুর অঞ্চলে চলতি আগস্টে স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কম বৃষ্টিপাত হওয়ায় আমনের খেতগুলোতে দেখা দিয়েছে পানির সংকট। বৃষ্টির অপেক্ষায় থাকা কৃষকদের এখন বাড়তি খরচ করে ভূগর্ভস্থ পানি তুলে সেচ দিতে হচ্ছে।

রাজশাহী ওয়াসার তথ্য অনুযায়ী, মহানগরীর পানি সরবরাহব্যবস্থা এখনো বড় অংশে ভূগর্ভস্থ পানিনির্ভর। ওয়াসার ওয়েবসাইটে নগরীতে দৈনিক পানির চাহিদা ১১৩ দশমিক ২৯ মিলিয়ন লিটার এবং উৎপাদন ৯৫ মিলিয়ন লিটার উল্লেখ করা হয়েছে। সরবরাহব্যবস্থার আওতায় রয়েছে মহানগরীর প্রায় ৮৪ শতাংশ মানুষ।

ওয়াসা জানিয়েছে, ভূগর্ভস্থ পানিতে আয়রন, ম্যাঙ্গানিজ ও হার্ডনেস তুলনামূলক বেশি। এ কারণে ভবিষ্যতে ভূ-উপরিস্থ পানি শোধন করে নগরবাসীকে সরবরাহের দিকে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ও নদী গবেষক অধ্যাপক চৌধুরী সারওয়ার জাহান বলেন, রাজশাহীর পানিসংকটের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য হলো—মহানগরীর পাশেই পদ্মা নদী থাকলেও নগরবাসীর পানির বড় অংশ আসে মাটির নিচ থেকে। নদীর পানি ব্যবহার করতে হলে তা সংগ্রহ, শোধন, জীবাণুমুক্তকরণ, সংরক্ষণ এবং বড় পাইপলাইন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সরবরাহ করতে হয়। অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে দীর্ঘদিন ধরে পদ্মার পানি শোধন করে নগরবাসীকে দেওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও এর বাস্তবায়ন ধীরগতির।

২০২১ সালের এক প্রতিবেদনে রাজশাহী ওয়াসা জানিয়েছিল, দৈনিক প্রায় ১৩ কোটি ৫০ লাখ লিটার চাহিদার বিপরীতে উৎপাদন ছিল ৯ কোটি ৯০ লাখ লিটার। উৎপাদিত পানির প্রায় ৯০ শতাংশই আসত ভূগর্ভস্থ উৎস থেকে। একই সময়ে পদ্মার পানি শোধনের মাধ্যমে সরবরাহ বাড়ানোর পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছিল।

বরেন্দ্র অঞ্চলের পানির অবস্থা নিয়ে গবেষণা করা অধ্যাপক চৌধুরী সারওয়ার জাহান বলেন, মহানগরীর বাইরে রাজশাহীর বরেন্দ্র অঞ্চলের পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। গোদাগাড়ী, তানোরসহ বিভিন্ন এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমাগত নিচে নামছে। গবেষণাভিত্তিক আলোচনায় দেখা গেছে, গোদাগাড়ী, তানোর ও নওগাঁর নিয়ামতপুরে প্রতি মাসে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর শূন্য দশমিক ০০৪ থেকে শূন্য দশমিক ০২৮ হারে নিম্নমুখী হচ্ছে। এতে বোঝা যায়, ভূগর্ভে পুনর্ভরণের তুলনায় পানি উত্তোলনের পরিমাণ বেশি।

গবেষকদের মতে, নির্বিচারে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের ফলে পানিধারক স্তর বা অ্যাকুইফারের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। শুষ্ক মৌসুমে সেচনির্ভর কৃষিতে বিপুল পরিমাণ ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করা হলেও সেই অনুপাতে বৃষ্টির পানি মাটির নিচে ফিরে যাচ্ছে না।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি ও কৃষিতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক গিয়াস উদ্দিন বলেন, বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষিব্যবস্থার সঙ্গে পানির সংকট সরাসরি যুক্ত। ভূ-পৃষ্ঠের পানি সংরক্ষণ, কৃত্রিমভাবে ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ, দক্ষ সেচব্যবস্থা এবং ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমানোর ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন।

রংপুরে বৃষ্টির অভাবে আমন নিয়ে শঙ্কা

এদিকে রংপুরে স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কম বৃষ্টিপাত হওয়ায় আমন চাষে দেখা দিয়েছে পানির সংকট। আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি আগস্টে রংপুরে ৪০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত হওয়ার কথা থাকলেও ২২ আগস্ট পর্যন্ত বৃষ্টি হয়েছে প্রায় ১০০ মিলিমিটার।

ফলে প্রকৃতিনির্ভর আমন চাষিরা এখন জমিতে ভূগর্ভস্থ পানি তুলে সেচ দিতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে উৎপাদন খরচও বেড়ে যাচ্ছে। কৃষকদের হিসাবে, একরপ্রতি সেচ দিতে খরচ হচ্ছে ৮ হাজার টাকার বেশি।

রংপুর বিভাগে এবার প্রায় ১১ লাখ হেক্টর জমিতে আমন চাষ হয়েছে। রংপুর মহানগরের খাসবাগ এলাকার আমন চাষি আসাদুজ্জামান আফজাল বলেন, বর্তমানে আমন ধানের বয়স দুই থেকে আড়াই মাস। এরই মধ্যে চারবার সেচ দিতে হয়েছে। প্রতি দোন (২৪ শতক) জমিতে প্রতি ঘণ্টা সেচ দিতে খরচ হচ্ছে ১২০ টাকা। চার দফায় ২২ থেকে ২৫ ঘণ্টা সেচ দিতে গিয়ে তাঁর খরচ হয়েছে ২ হাজার টাকার বেশি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজশাহীতে দীর্ঘমেয়াদে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমানো এবং রংপুরে বৃষ্টিনির্ভর কৃষির পাশাপাশি পানি ব্যবস্থাপনা জোরদার করা জরুরি। তা না হলে একদিকে পানির স্তর আরও নিচে নামবে, অন্যদিকে অনাবৃষ্টির সময় কৃষকের উৎপাদন খরচ বাড়তে থাকবে। দেশের উত্তরাঞ্চলে পানি ব্যবস্থাপনায় এখনই সমন্বিত ও টেকসই পরিকল্পনা নেওয়া প্রয়োজন।