মধ্যনগরে বংশীকুন্ডা দক্ষিণ ইউনিয়নের সুজন মেম্বারের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দূর্নীতির অভিযোগ
সুনামগঞ্জের মধ্যনগর উপজেলার বংশীকুন্ডা দক্ষিণ ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য সুজন মিয়ার বিরুদ্ধে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ, প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম, পলমাটি প্রাইমারি স্কুলের রাস্তা নির্মাণ প্রকল্পের সমূদয় অর্থ আত্মসাৎ, উপকারভোগী তালিকায় ব্যাপক অনিয়ম, জমি- জমার কাগজ সংক্রান্ত হয়রানি, মামলা বানিজ্য, ক্ষতিগ্রস্তদের নাম তালিকাভুক্তির জন্য টাকা নেওয়া এবং “ইসলামি রিলিফ বাংলাদেশ “এর গরীর অসহায়দের নামের পরিবর্তে নিজেদের নামে অনুদান সামগ্রী তুলে আত্মসাতসহ নানা অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি, অভিযোগকারী ও ভুক্তভোগীদের বক্তব্য,বিভিন্ন সময় পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ,ভুক্তভোগীদের বক্তব্য, অডিও রেকর্ড এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্রের তথ্যের ভিত্তিতে এসব অভিযোগের বিষয়ে অনুসন্ধান করা হয়েছে।
ভুক্তভোগী মহিলার বক্তব্য
৯নং ওয়াডের বাসিন্দা বীরসিংহ পাড়ার দরিদ্র মহিলা রাশেদা বেগম , স্বামী মৃত শামছুদ্দিন জানান – প্রায় ৩ বছর আগে সুজন মেম্বার আমাকে টিউবওয়েল দিবে বলে ১০ হাজার টাকা নিয়েছেন, আমি ও আমার ছেলে ঈসমাইল কতবার সুজন মেম্বারের সাথে যোগাযোগ করে অনুরোধ করেছি হয় টিউবওয়েল দাও নতুবা টাকা ফেরত দাও উনি কোনটাই দিচ্ছেন না, রাশেদা বেগম এই প্রতিবেদকের কাছে অভিযোগ করে বলেন সুজন মেম্বার এই ভাবে আরো অনেকের কাছ থেকেই প্রতারণা করে টাকা নিচ্ছেন আমরা আপনাদের সহযোগিতায় প্রশাসন কে অনুরোধ করবো, তার কাছ থেকে আমাকে টিউবওয়েল বা টাকা উদ্ধার করে দেয়ার জন্য।
পলমাটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের রাস্তা নির্মাণ প্রকল্পের সমূদয় টাকা আত্মসাৎ
পলমাটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের রাস্তা নির্মাণ প্রকল্পের বরাদ্দের সমূদয় টাকা আত্মসাত করেছেন বলে স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেছেন।
পলমাটি গ্রামের বাসিন্দা কবি- ও সাহিত্যিক আকিকুর রহমান তালুকদার বলেন, বিদ্যালয়ের রাস্তা নির্মাণ প্রকল্পে বরাদ্দের অর্থে এক টাকার কাজও করেনি। ঐ প্রকল্পের সমূদয় টাকা উত্তোলনের অভিযোগ করেছেন গ্রামবাসী।
অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে প্রকল্পের অনুমোদনপত্র, বরাদ্দের পরিমাণ, প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির নথি, মাস্টাররোল, বিল-ভাউচার এবং প্রকল্পের বাস্তব কাজের পরিমাণ পরিমাপ করা জরুরি বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
ক্ষতিগ্রস্ত তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির জন্য টাকা নেওয়ার অভিযোগ
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় কয়েকজনের (বক্তব্য রেকর্ডকৃত) অভিযোগ, বিভিন্ন দুর্যোগ ও সরকারি সহায়তায় ক্ষতিগ্রস্ত তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করে দেওয়ার কথা বলে টাকা নেওয়া হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, (অডিও রেকর্ড) ২০২২ সালের ভয়াবহ বন্যার সময় বেসরকারি সংস্থার পক্ষ থেকে ঘর নির্মাণ করে দেওয়ার কথা বলে কয়েকজনের কাছ থেকে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছিল। স্থানীয়ভাবে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা ও হস্তক্ষেপের পর কয়েকজনকে আংশিক টাকা ফেরত দেওয়া হলেও আরও কয়েকজনের টাকা ফেরত দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।
ইসলামি রিলিফ বাংলাদেশের ত্রাণ বিতরণের তালিকায় ব্যাপক অনিয়ম।
অভিযোগকারীদের দাবি, ৯ নং ওয়ার্ডের ৫ টি গ্রামের প্রকৃত অসহায় পরিবারের পরিবর্তে ইউপি সদস্য সুজন মিয়ার স্ত্রী, সন্তান, ভাই-বোন, শালা-শালী, শমুন্দীসহ নিকটাত্মীয়দের নামে “ইসলামী রিলিফ বাংলাদেশ” সহায়তার নগদ টাকা, চাউল ও অন্যান্য সামগ্রী উত্তোলন করা হয়েছে।
জমির -জমার সমস্যা সমাধানের কথা বলে হয়রানি ও টাকা নেওয়ার অভিযোগ
বীরসিংহ পাড়ার বাসিন্দা বিল্লাল হোসেন অভিযোগ করেন, তার পারিবারিক জমি-সংক্রান্ত সমস্যার সমাধান ও নামজারি করে দেওয়ার কথা বলে সুজন মিয়া তার কাছ থেকে প্রথমে ১০ হাজার টাকা নেন। পরে উচ্ছেদ মামলা করার কথা বলে নগদে ও বিকাশে ভিন ভিন্ন সময়ে আরও ৫০ হাজার টাকা নেন।
বিল্লাল হোসেনের ভাষ্য, টাকা দেওয়ার পরও সুজন মিয়া আজ পর্যন্ত কোনো কাজও করে দেননি।
বিল্লাল হোসেন আবেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন- আমার আগে সুজন মেম্বার মইরা গেলে আমি আমার প্রাপ্য টাকার জন্য তার মৃত লাশ ধরে রাখমু।
কৃষিজমি থেকে মাটি কাটার অভিযোগ
পলমাটি গ্রামের কৃষক জাকির হোসেন অভিযোগ করেন, তার কৃষিজমি থেকে রাতের বেলায় মাটি কাটার যন্ত্র( বেকু) দিয়ে মাটি উত্তোলন করে বিক্রি করা হয়েছে। এ ঘটনায় সুজন মিয়ার লোকজন জড়িত বলে তিনি অভিযোগ করেন।
এ বিষয়ে তিনি মধ্যনগর উপজেলা প্রশাসনের বরাবর লিখিত অভিযোগ করেছেন।
‘মামলা-বাণিজ্য’র অভিযোগ
সুজন মিয়ার বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত বিরোধ ও স্থানীয় প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে মামলা-মোকদ্দমার অভিযোগও করেছেন কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা।
স্থানীয়দের কয়েকজনের দাবি, ৫ আগস্টের পর বিভিন্ন ব্যক্তিকে রাজনৈতিক পরিচয়ে মামলায় জড়ানো হয়েছে। সুজন মিয়ার নিজ গ্রামের বাসিন্দা মোশাররফ হোসেন কে কোনো অভিযোগ ছাড়াই আওয়ামী লীগের ট্যাগ দিয়ে গ্রেফতার করানো হয়েছে। তার পাশের বাড়ির যুবদলের কর্মী মিজানুর রহমান এই প্রতিবেদক কে জানান (অডিও রেকর্ডকৃত)আমাকে মিথ্যা ও অন্যায় ভাবে যুবলীগের কমিটিতে এডিটিং এর মাধ্যমে নাম অন্তর্ভুক্ত করে সুজন মেম্বার গ্রেফতার করাইছে।
অভিযোগের প্রতিবাদ করলেই হয়রানির আশঙ্কা
স্থানীয় কয়েকজন অভিযোগকারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বিভিন্ন অনিয়মের বিষয়ে কথা বললে তাদের বিরুদ্ধে মামলা বা হামলার ভয় দেখানো হয়। ফলে অনেকেই প্রকাশ্যে বক্তব্য দিতে সাহস পান না।
চাপাইতি গ্রামের কৃতি সন্তান সুইডেন প্রবাসী ও উপজেলা বি এন পির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক জনাব মাহবুব আলম বলেন – সুজন মিয়ার কার্যক্রম সীমা অতিক্রম করেছে তার ব্যাপারে যা শুনলাম ও দেখতেছি তা কোন সভ্য সমাজ মেনে নিতে পারেনা। তার লুটপাট ও দূর্নীতির সংবাদ প্রকাশ হওয়ায় সে প্রতিহিংসা পরায়ণ হয়ে উপজেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি আমাদের এলাকার সন্তান আব্দুল আউয়াল মিছবাহর বিরুদ্ধে যে জঘন্য মিথ্যা চাঁদাবাজির অভিযোগ করেছে সেটা নিন্দা জানানোর ভাষা আমার জানা নেই।
পলমাটি গ্রামের রফিকুল ইসলাম জানান স্থানীয় অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রতিবাদ করায় সাধারণ মানুষ হয়রানির আশঙ্কায় থাকেন। তিনি বলেন বিভিন্ন অনিয়ম,আত্মসাৎ ও লুটপাট নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর উপজেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি সাংবাদিক আব্দুল আউয়াল মিছবাহর বিরুদ্ধেও ডিসির বরাবর জঘন্য মিথ্যা ও বানোয়াট অভিযোগ করেছে সুজন মিয়ায়।
ভুক্তভোগীদের বক্তব্য
অনুসন্ধানে কথা বলা কয়েকজন ভুক্তভোগী দাবি করেন, এসব অভিযোগের সরজমিনে নিরপেক্ষ তদন্ত হলে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে।
প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
এতগুলো অভিযোগ থাকার পরেও সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলো এসব বিষয়ে কার্যকর তদন্ত কেন করছেন না —তা নিয়েও স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
সচেতন নাগরিকদের দাবি, অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখতে স্হানীয় উপজেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের পক্ষ থেকে নিরপেক্ষ তদন্ত করা হোক। দুর্নীতি দমন কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মাধ্যমে নথিপত্র যাচাই করা হোক।
বিশেষ করে—
– সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের অনুমোদনপত্র ও বরাদ্দ;
– প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির নথি;
– মাস্টাররোল;
– বিল-ভাউচার;
– কাজের পরিমাপ ও বাস্তব অগ্রগতি;
– উপকারভোগীদের তালিকা ওভূক্তভোগীদের বক্তব্য যাচাই।
– ইসলামি রিলিফ বাংলাদেশ”এর বিতরণ তালিকা ও গ্রহণের প্রমাণ;
– জমি ও নামজারি সংক্রান্ত নথি;
– অভিযোগের তদন্ত প্রতিবেদন
যাচাই করলেই অভিযোগগুলোর প্রকৃত ভিত্তি নির্ধারণ করা সম্ভব হবে।
অভিযোগ গুলোর বিষয়ে সুজন মেম্বারের বক্তব্য জানতে বার বার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি আননোন নাম্বারে ফোন করিলে তিনি সাংবাদিক পরিচয় পেয়েই ফোন কেটে বন্ধ করে দেন।
সরেজমিন অনুসন্ধান, ভোক্তভোগী ও উপকারভোগীদের বক্তব্য গ্রহণ,সরকারি প্রকল্পের কাজের অনুসন্ধ্যান ও এ সংক্রান্ত নথি যাচাই, অর্থ লেনদেনের প্রমাণের (অডিও রেকর্ড) এবং অভিযুক্ত ব্যক্তির বক্তব্যের সমন্বয়ে প্রকৃত ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে।


























