গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে ধুঁকছে পুঁজিবাজার, ১৫ দিনে লেনদেন কমেছে ৫৮%
দেশের চলমান গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব এবার সরাসরি পড়তে শুরু করেছে পুঁজিবাজারে। জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তায় শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে। এর প্রভাব তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর বিক্রি, আয় ও মুনাফায় পড়তে পারে—এমন উদ্বেগে শেয়ার কেনাবেচায় সতর্ক হয়ে উঠেছেন বিনিয়োগকারীরা।
সাম্প্রতিক বাজারচিত্রেও এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। গত ৪ আগস্ট দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) দৈনিক লেনদেন হয়েছিল ১ হাজার ১১১ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। মাত্র ১৫ কার্যদিবস পর ২৭ আগস্ট তা নেমে আসে ৪৬৭ কোটি ১ লাখ টাকায়। অর্থাৎ এ সময়ে লেনদেন কমেছে ৬৪৪ কোটি ৪৮ লাখ টাকা বা প্রায় ৫৮ শতাংশ।
বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, পুঁজিবাজার মূলত কোম্পানির ভবিষ্যৎ আয় ও মুনাফার প্রত্যাশার ওপর নির্ভরশীল। কোনো কোম্পানির উৎপাদন সক্ষমতা কমে গেলে স্বাভাবিকভাবেই তার ভবিষ্যৎ আয় নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। আর এই অনিশ্চয়তা বাড়লে বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতাও কমে যায়।
গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে উৎপাদনমুখী কোম্পানিগুলোর ওপর। পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ না থাকলে কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা কমে যায়। এতে একদিকে উৎপাদন ব্যয় বাড়ে, অন্যদিকে পণ্য বিক্রির পরিমাণ কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে গ্যাস সরবরাহের ঘাটতির কারণে বিভিন্ন শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। এমনকি একটি তালিকাভুক্ত খাদ্য কোম্পানির কারখানাও গ্যাস সংকটের কারণে বন্ধ হয়ে যাওয়ার তথ্য এসেছে।
এ পরিস্থিতিতে বস্ত্র, সিরামিক, কাগজ, প্লাস্টিক, খাদ্য ও ইস্পাতসহ জ্বালানিনির্ভর বিভিন্ন খাতের তালিকাভুক্ত কোম্পানির আয় ও মুনাফায় চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা করছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা।
জ্বালানি সংকট শুধু কোম্পানির উৎপাদনেই প্রভাব ফেলছে না, বিনিয়োগকারীদের মনস্তত্ত্বেও এর প্রভাব পড়ছে। গ্যাসের সরবরাহ কখন স্বাভাবিক হবে, উৎপাদন কতটা ব্যাহত হবে এবং এর ফলে কোম্পানির মুনাফা কতটা কমতে পারে—এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর না থাকায় অনেক বিনিয়োগকারী নতুন করে অর্থ বিনিয়োগের পরিবর্তে অপেক্ষার কৌশল নিয়েছেন।
এদিকে আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে গ্যাস সংকট ও মার্জিন ঋণের নিয়ম নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যেই ডিএসইতে ব্যাপক দরপতন দেখা যায়। ১৬ আগস্ট ২৪৭টি কোম্পানির শেয়ারদর কমার বিপরীতে বেড়েছিল মাত্র ১০২টির।
বাজারে নতুন অর্থের প্রবাহ কমে যাওয়াও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। নতুন অর্থ না আসায় বিদ্যমান বিনিয়োগকারীদের অর্থের ওপরই বাজারের বড় অংশের লেনদেন নির্ভর করছে। ফলে বিক্রির চাপ তৈরি হলে তা সামাল দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত ক্রয়চাহিদা তৈরি হচ্ছে না। এর ফলে লেনদেন কমার পাশাপাশি বাজারে তারল্য সংকটও স্পষ্ট হচ্ছে।
বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, পুঁজিবাজারে টেকসই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা ফিরিয়ে আনতে শুধু শেয়ারের দরপতন ঠেকানো যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন নতুন অর্থের প্রবাহ এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা।
এদিকে দেশের গ্যাস সংকট মোকাবিলায় তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ানো হচ্ছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম বেশি থাকায় আমদানি ব্যয়ও বাড়ছে। আগস্টের শুরুতে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনার দাম প্রতি এমএমবিটিইউ ২০ ডলারের বেশি ছিল।
জ্বালানি আমদানির ব্যয় বাড়লে উৎপাদন খরচ, মূল্যস্ফীতি এবং কোম্পানির পরিচালন ব্যয়ের ওপরও চাপ বাড়তে পারে। একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে চাপ তৈরি হলে আমদানিনির্ভর কোম্পানিগুলোর ব্যয় আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে জ্বালানি সংকটের প্রভাব পুঁজিবাজারের সব কোম্পানির ওপর সমান নয়। যেসব কোম্পানির উৎপাদন সরাসরি গ্যাস ও বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল, তাদের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। অন্যদিকে ব্যাংক, বিমা, টেলিযোগাযোগ বা কম জ্বালানি-নির্ভর সেবাখাতের কোম্পানিগুলো তুলনামূলক কম সরাসরি প্রভাবিত হতে পারে।
এ কারণে বর্তমান বাজারে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে কোম্পানিভিত্তিক বাছাইয়ের প্রবণতা বাড়ছে। শক্তিশালী ব্যালান্সশিট, কম ঋণ, স্থিতিশীল নগদপ্রবাহ এবং জ্বালানি সংকটে তুলনামূলক কম ঝুঁকিপূর্ণ কোম্পানিগুলো বিনিয়োগকারীদের কাছে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে পুঁজিবাজারেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। উৎপাদন স্বাভাবিক হলে কোম্পানির আয় ও মুনাফা নিয়ে অনিশ্চয়তা কমবে। একই সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের আস্থাও ফিরতে পারে।
তবে এর জন্য শুধু সাময়িকভাবে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো নয়, দীর্ঘমেয়াদে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। স্থানীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়া, এলএনজি সরবরাহের অনিশ্চয়তা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে উচ্চমূল্য—সব মিলিয়ে জ্বালানি সংকটের প্রভাব এখন অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে ছড়িয়ে পড়ছে।
ফলে জ্বালানি সংকট এখন শুধু শিল্প উৎপাদন বা বিদ্যুৎ খাতের সমস্যা নয়; এটি কোম্পানির আয়, বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা, বাজারের তারল্য এবং শেষ পর্যন্ত দেশের পুঁজিবাজারের গতিপথেও প্রভাব ফেলছে।

























