বিএনপি ও সরকারে বড় রদবদলের আভাস
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি পদে দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার পর বিএনপি ও সরকারের অভ্যন্তরে বড় ধরনের পরিবর্তনের আলোচনা শুরু হয়েছে। রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেওয়ার আগে তাঁকে মন্ত্রীর পদ ছাড়তে হবে। একই সঙ্গে দলের মহাসচিব, জাতীয় স্থায়ী কমিটিসহ বিএনপির বিভিন্ন সাংগঠনিক পদ থেকেও তাঁকে সরে দাঁড়াতে হবে।
মির্জা ফখরুলের পদত্যাগের ফলে সরকারে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে পরিবর্তন আসতে পারে বলে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা রয়েছে। পাশাপাশি বিএনপির মহাসচিব পদ, জাতীয় স্থায়ী কমিটি এবং ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচন নিয়েও নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দল ও সরকারে সম্ভাব্য এসব পরিবর্তনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন বিএনপির দলীয় প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে আসতে পারেন সালাহউদ্দিন
মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হিসেবে বঙ্গভবনে গেলে তাঁর দায়িত্বে থাকা স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়টি শূন্য হবে। গুরুত্বপূর্ণ এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে দেওয়া হতে পারে বলে গুঞ্জন রয়েছে।
সালাহউদ্দিন আহমদ স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে গেলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে পরিবর্তন আসতে পারে। এ ক্ষেত্রে বর্তমান পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়ার আলোচনা রয়েছে। একই সঙ্গে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমকে পূর্ণ মন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়েও আলোচনা চলছে।
ঠাকুরগাঁও-১ আসনে কে?
রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে মির্জা ফখরুলের সংসদীয় আসন ঠাকুরগাঁও-১ শূন্য ঘোষণা করে উপনির্বাচন আয়োজন করতে হবে। এই আসনে বিএনপির প্রার্থী কে হবেন, তা নিয়েও শুরু হয়েছে জল্পনা।
দলীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনা রয়েছে, মির্জা পরিবারের সদস্যদের মধ্য থেকেই কাউকে প্রার্থী করা হতে পারে। এ ক্ষেত্রে মির্জা ফখরুলের মেয়ে অথবা তাঁর ভাইয়ের নাম আলোচনায় রয়েছে।
রিজভীর হাতে মহাসচিবের দায়িত্ব
মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি পদে গেলে বিএনপির মহাসচিব পদও শূন্য হবে। এরই মধ্যে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
এর আগে মহাসচিব পদে সালাহউদ্দিন আহমদ, জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ডা. জাহিদ এবং যুগ্ম মহাসচিব শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানির নামও আলোচনায় ছিল। দলীয় কাউন্সিলের মাধ্যমে মহাসচিব পদটি পরবর্তী সময়ে পূর্ণাঙ্গ করার উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।
স্থায়ী কমিটিতে আসতে পারেন নতুন মুখ
বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটিতেও পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। দলীয় সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, তরুণ, ত্যাগী ও সাংগঠনিকভাবে সক্রিয় নেতাদের পাশাপাশি অভিজ্ঞ নেতাদেরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থতার কারণে দলীয় কর্মকাণ্ডে সক্রিয় নন। অন্যদিকে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ স্পিকারের দায়িত্ব নেওয়ার পর দলের সাংগঠনিক পদে নেই। মির্জা ফখরুলও দলীয় পদগুলো থেকে পদত্যাগ করেছেন।
নতুন করে স্থায়ী কমিটিতে যাঁদের নাম আলোচনায় রয়েছে তাঁদের মধ্যে আছেন ভাইস চেয়ারম্যান ও সরকারদলীয় চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি, শামসুজ্জামান দুদু, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহ, মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টু এবং চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা জয়নুল আবদিন ফারুক।
মন্ত্রিসভায়ও আসতে পারে পরিবর্তন
বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের ছয় মাস পূর্ণ হওয়ার আগেই মন্ত্রিসভায় সম্ভাব্য রদবদল নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা জোরালো হয়েছে। আগামী ১৭ আগস্ট সরকারের ছয় মাস পূর্ণ হতে যাচ্ছে।
সরকারসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের কর্মদক্ষতা, মন্ত্রণালয় পরিচালনায় সক্ষমতা এবং সরকারের ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের অগ্রগতি মূল্যায়ন করা হচ্ছে। এই মূল্যায়নের ভিত্তিতে কয়েকজনের দপ্তর পরিবর্তন, কারও দায়িত্ব কমানো এবং একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
একই সঙ্গে মন্ত্রিসভায় নতুন মুখ যুক্ত করার বিষয়েও আলোচনা চলছে। বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আবদুল মঈন খান ও সেলিমা রহমানকে মন্ত্রী করার সম্ভাবনার কথা আলোচনায় রয়েছে।
এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীকে টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী করার বিষয়েও আলোচনা রয়েছে। বিএনপি নেতা জয়নুল আবদিন ফারুককেও মন্ত্রিসভায় যুক্ত করা হতে পারে বলে রাজনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে।
মন্ত্রিসভায় বিএনপির যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলগুলোর কয়েকজন নেতাকে যুক্ত করার বিষয়েও আলোচনা রয়েছে।
১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা পর্যালোচনা
প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে উপদেষ্টা ও বিশেষ সহকারীদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটি সরকারের কার্যক্রম সূক্ষ্মভাবে পর্যালোচনা করছে।
তিনি বলেন, ক্ষমতায় আসার প্রথম ১৮০ দিনের অর্জন, কর্মকাণ্ড ও সীমাবদ্ধতা নিয়ে পর্যালোচনা চলছে। এই প্রক্রিয়া শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতির সামনে সরকারের অবস্থান ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরবেন।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তারেক রহমানের
মির্জা ফখরুলকে রাষ্ট্রপতি পদে পাঠানো, তাঁর পরিবর্তে বিএনপির মহাসচিবের দায়িত্ব কার হাতে থাকবে, জাতীয় স্থায়ী কমিটিতে কারা যুক্ত হবেন এবং মন্ত্রিসভায় কী ধরনের রদবদল হবে—সব ক্ষেত্রেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দলীয় প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নেবেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
সব মিলিয়ে মির্জা ফখরুলের রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়নকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও সরকারের সাংগঠনিক কাঠামোতে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।



























