মহাবিশ্বের রহস্য উন্মোচনে বাংলাদেশের লামিয়া, গবেষণায় যুক্ত নাসার নতুন প্রজন্মের টেলিস্কোপে
বাংলাদেশ থেকে বিশ্ববিজ্ঞানের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর গল্প খুব বেশি নয়। তবে সেই অল্প কয়েকটি অনুপ্রেরণার গল্পের একটি এখন লামিয়া আশরাফ মওলার। মহাবিশ্বের শুরুর দিকের গ্যালাক্সি, ডার্ক ম্যাটার, ডার্ক এনার্জি এবং বিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরের মহাজাগতিক রহস্য নিয়ে গবেষণা করছেন তিনি। নাসার James Webb Space Telescope (JWST) এর গবেষণা দলের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণভাবে কাজ করার পর এবার যুক্ত হয়েছেন নাসার নতুন প্রজন্মের Nancy Grace Roman Space Telescope মিশনের গবেষণায়।
লামিয়ার গবেষণা শুধু মহাবিশ্বের অতীত জানার ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ নয়; আধুনিক জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানের ভবিষ্যৎ গবেষণার ক্ষেত্রেও তা ভূমিকা রাখছে।
### ঢাকার শিক্ষার্থী থেকে জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানী
ঢাকায় বেড়ে ওঠা লামিয়া আশরাফ মওলা পড়াশোনা করেছেন Willes Little Flower School and College-এ। সেখানে তিনি ও-লেভেল ও এ-লেভেল সম্পন্ন করেন।
শৈশবে মানুষের মস্তিষ্ক ও নিউরোসায়েন্সের প্রতি আগ্রহ ছিল তাঁর। এ কারণে উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার পর শুরুতে নিউরোসায়েন্স নিয়ে পড়াশোনার পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু কলেজ ক্যাম্পাসের টেলিস্কোপে প্রথমবার মহাকাশ পর্যবেক্ষণের অভিজ্ঞতা তাঁর জীবনের গতিপথ বদলে দেয়। এরপর জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানকেই নিজের গবেষণার ক্ষেত্র হিসেবে বেছে নেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের Wellesley College থেকে অ্যাস্ট্রোফিজিক্সে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন লামিয়া। সেখানে পড়াশোনার সময় পর্যবেক্ষণভিত্তিক জ্যোতির্বিজ্ঞানে দক্ষতার স্বীকৃতি হিসেবে তিনি John Charles Duncan Prize in Astronomy এবং **Phyllis J. Fleming Prize for Distinction in Physics** লাভ করেন।
এরপর বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ গবেষণা প্রতিষ্ঠান Yale University থেকে পিএইচডি সম্পন্ন করেন তিনি। তাঁর গবেষণার তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানী অধ্যাপক Pieter van Dokkum।
পিএইচডি শেষে কানাডার University of Toronto-এর Dunlap Institute for Astronomy and Astrophysics-এ পোস্টডক্টরাল ফেলো হিসেবে গবেষণা করেন। বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের Wellesley College-এর Whitin Observatory-তে Assistant Professor of Astronomy হিসেবে কর্মরত।
JWST গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
২০২০ সাল থেকে লামিয়া James Webb Space Telescope (JWST)এর আন্তর্জাতিক গবেষণা দলের সঙ্গে যুক্ত। এই টেলিস্কোপের মাধ্যমে মহাবিশ্বের প্রথমদিকের গ্যালাক্সিগুলোর গঠন ও বিবর্তন নিয়ে গবেষণা করছেন তিনি।
তাঁর উল্লেখযোগ্য গবেষণার একটি হলো প্রাচীন গ্যালাক্সি Firefly Sparkle নিয়ে কাজ। এই গবেষণা ২০২৪ সালে আন্তর্জাতিকভাবে মর্যাদাপূর্ণ বৈজ্ঞানিক সাময়িকী Natureএ প্রকাশিত হয়। গবেষণাটি মহাবিশ্বের শুরুর সময়ে গ্যালাক্সিগুলো কীভাবে গঠিত ও বিকশিত হচ্ছিল, সে সম্পর্কে নতুন ধারণা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এবার Roman Space Telescope মিশনে
JWST-এর পর এবার নাসার Nancy Grace Roman Space Telescopeএর গবেষণা কার্যক্রমেও যুক্ত হয়েছেন লামিয়া।
এই টেলিস্কোপের মাধ্যমে কোটি কোটি গ্যালাক্সি পর্যবেক্ষণ ও বিপুল পরিমাণ মহাজাগতিক তথ্য সংগ্রহ করা হবে। এসব তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে ডার্ক ম্যাটার, ডার্ক এনার্জি, মহাবিশ্বের বিবর্তন এবং বহির্গ্রহ সম্পর্কে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়ার আশা করছেন বিজ্ঞানীরা।
লামিয়া ও তাঁর গবেষক দল এই বিপুল পরিমাণ তথ্য বিশ্লেষণের জন্য অত্যাধুনিক পদ্ধতি তৈরিতে কাজ করছেন। ভবিষ্যতে এসব প্রযুক্তি ও গবেষণা পদ্ধতি জ্যোতির্বিজ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলাদেশের তরুণদের জন্যও কাজ করছেন
গবেষণার পাশাপাশি বাংলাদেশের শিক্ষার্থী ও তরুণ গবেষকদের বিজ্ঞানচর্চায় উৎসাহিত করতেও কাজ করছেন লামিয়া। তিনি বাংলাদেশের জ্যোতির্বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র Center for Astronomy, Space Science and Astrophysics (CASSA)এর সঙ্গে যুক্ত। দেশে জ্যোতির্বিজ্ঞান গবেষণা ও বিজ্ঞানচর্চা জনপ্রিয় করতে বক্তৃতা ও মেন্টরশিপের মাধ্যমেও ভূমিকা রাখছেন তিনি।
ঢাকার একজন শিক্ষার্থীর মহাকাশ নিয়ে কৌতূহল থেকে শুরু হওয়া যাত্রা আজ তাঁকে মহাবিশ্বের প্রাচীনতম গ্যালাক্সি ও মহাজাগতিক রহস্য নিয়ে আন্তর্জাতিক গবেষণার অঙ্গনে নিয়ে গেছে।
লামিয়া আশরাফ মওলার এই পথচলা বাংলাদেশের তরুণদের জন্যও অনুপ্রেরণার। তাঁর গল্প দেখিয়ে দেয়, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিজ্ঞানচর্চার জন্য প্রয়োজন কৌতূহল, অধ্যবসায়, জ্ঞানার্জনের আগ্রহ এবং বড় স্বপ্ন দেখার সাহস।
























