1. admin@kagojerbarta.com : admin :
  2. amirsadeky88@gmail.com : amirsadeky :
  3. kamrul304076@gmail.com : Kamrul :
  4. jamalpurbakshiganj@gmail.com : Kamrulbk :
  5. motin.imran07051986@gmail.com : motin.imran07051986@gmail.com :
  6. seyam2858@gmail.com : seyam :
ঢাকা ০৩:৪৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৯ অগাস্ট ২০২৬, ৪ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জহির রায়হান: বাংলা চলচ্চিত্র ও সাহিত্যের অমর নির্মাতা

বিনোদন ডেস্ক:
সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

ফাল্গুনের আগুনে জ্বলে ওঠা এক অমর রাজপথের নাম জহির রায়হান। সাহিত্য, সাংবাদিকতা ও চলচ্চিত্র—তিন ক্ষেত্রেই অসামান্য প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে যাওয়া এই গুণী ব্যক্তিত্ব ১৯৩৫ সালের ১৯ আগস্ট ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার মজুপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

বাবা মাওলানা মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহর কর্মসূত্রে কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসার অ্যাংলো-পার্সিয়ান বিভাগে পড়াশোনা শুরু করেন তিনি। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর পরিবারের সঙ্গে ঢাকায় চলে আসেন। ১৯৫৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে সাহিত্য ও সাংবাদিকতায় পুরোপুরি আত্মনিয়োগ করেন।

সাংবাদিক হিসেবে ‘যুগের আলো’ পত্রিকার মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করেন জহির রায়হান। পরবর্তীতে ‘খাপছাড়া’, ‘যান্ত্রিক’, ‘সিনেমা’ এবং ‘প্রবাহ’ পত্রিকার সঙ্গে বিভিন্নভাবে যুক্ত ছিলেন। ১৯৫৫ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘সূর্যগ্রহণ’। এরপর ‘শেষ বিকেলের মেয়ে’, ‘আরেক ফাল্গুন’ ও ‘হাজার বছর ধরে’র মতো কালজয়ী সাহিত্যকর্ম উপহার দেন তিনি। ‘হাজার বছর ধরে’ উপন্যাসের জন্য ১৯৬৪ সালে অর্জন করেন আদমজী সাহিত্য পুরস্কার।

চলচ্চিত্রে নতুন দিগন্ত

১৯৫৭ সালে ‘জাগো হুয়া সাভেরা’ চলচ্চিত্রে সহকারী হিসেবে রুপালি জগতে যাত্রা শুরু করেন জহির রায়হান। ১৯৬১ সালে ‘কখনো আসেনি’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। এরপর একের পর এক চলচ্চিত্র নির্মাণ করে বাংলা সিনেমায় নতুন ধারার সূচনা করেন তিনি।

১৯৬৪ সালে পাকিস্তানের প্রথম উর্দু রঙিন চলচ্চিত্র ‘সঙ্গম’ এবং পরের বছর প্রথম সিনেমাস্কোপ চলচ্চিত্র ‘বাহানা’ নির্মাণ করেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে ‘বেহুলা’, ‘কাঁচের দেয়াল’ ও ‘আনোয়ারা’।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়া জহির রায়হানের ওপর একুশের চেতনার গভীর প্রভাব ছিল। সেই চেতনারই শক্তিশালী বহিঃপ্রকাশ ঘটে তাঁর কালজয়ী চলচ্চিত্র ‘জীবন থেকে নেয়া’-তে।

মুক্তিযুদ্ধের সময় কলকাতায় গিয়ে চলচ্চিত্রটি প্রদর্শন করেন তিনি। সেখানে সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন ও ঋত্বিক ঘটকের মতো বরেণ্য নির্মাতারাও উপস্থিত ছিলেন। চলচ্চিত্রটি ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করে।

মুক্তিযুদ্ধের ওপর নির্মিত তাঁর ঐতিহাসিক প্রামাণ্যচিত্র ‘স্টপ জেনোসাইড’ বিশ্ববিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছিল। চলচ্চিত্রটির প্রদর্শনী থেকে পাওয়া অর্থ তিনি মুক্তিযোদ্ধা তহবিলে দান করেন।

অন্তর্ধান ও অমর স্মৃতি

স্বাধীনতার পর ১৯৭১ সালের ১৭ ডিসেম্বর ঢাকায় ফেরেন জহির রায়হান। এরপর তিনি বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের খুঁজে বের করা এবং হত্যাকাণ্ডের তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহে উদ্যোগী হন। গঠিত হয় বুদ্ধিজীবী হত্যা তদন্ত কমিটি।

জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি ঘোষণা করেছিলেন, বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের পেছনের মূল ষড়যন্ত্রকারীদের মুখোশ উন্মোচন করবেন। কিন্তু সেই সত্য প্রকাশের সুযোগ আর পাননি তিনি।

১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি নিখোঁজ ভাই শহীদুল্লাহ কায়সারকে মিরপুরে আটকে রাখা হয়েছে—এমন খবর পেয়ে জহির রায়হান সেখানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ছোট ভাই জাকারিয়া হাবিব, শ্যালক বাবুল ও শাহরিয়ার কবিরসহ কয়েকজনের সঙ্গে তিনি মিরপুরের উদ্দেশে রওনা হন। নিরাপত্তার কারণে সেনাবাহিনী অন্যদের আটকে দিলেও জহির রায়হান সেনা ও পুলিশের বহরের সঙ্গে মিরপুর ১২ নম্বরের দিকে এগিয়ে যান।

এরপর মিরপুরের কালাপানি পানির ট্যাংকের কাছে তৎকালীন বিহারি ও পাকিস্তানি সৈন্যদের হামলার ঘটনায় তিনি নিখোঁজ হন। পরদিন ৩১ জানুয়ারি মিরপুর এলাকা মুক্ত হলেও তাঁর মরদেহ আর উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

তাঁর অন্তর্ধান ও মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দাবি ও মতামত উঠে এসেছে। পরিবারের ধারণা, রাতের অন্ধকারে তাঁর মরদেহ গুম করা হয়েছিল। আবার জহির রায়হান মুজিববাহিনীর হাতে নিহত হয়েছিলেন বলেও দাবি করেছিলেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক নির্মল সেন। তবে তাঁর অন্তর্ধানের প্রকৃত রহস্য আজও পুরোপুরি উদ্ঘাটিত হয়নি।

বাংলা সাহিত্য ও চলচ্চিত্রে জহির রায়হানের অবদান তাঁকে পরিণত করেছে এক অমর স্রষ্টায়। তাঁর সৃষ্টিকর্ম আজও ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, মানবতা ও শোষণের বিরুদ্ধে সংগ্রামের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ দলিল হয়ে আছে।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :
  • আপডেট সময় : ০৪:৫৭:৩১ পূর্বাহ্ণ, বুধবার, ১৯ আগস্ট ২০২৬ ৪ বার পড়া হয়েছে

জহির রায়হান: বাংলা চলচ্চিত্র ও সাহিত্যের অমর নির্মাতা

আপডেট সময় : ০৪:৫৭:৩১ পূর্বাহ্ণ, বুধবার, ১৯ আগস্ট ২০২৬

ফাল্গুনের আগুনে জ্বলে ওঠা এক অমর রাজপথের নাম জহির রায়হান। সাহিত্য, সাংবাদিকতা ও চলচ্চিত্র—তিন ক্ষেত্রেই অসামান্য প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে যাওয়া এই গুণী ব্যক্তিত্ব ১৯৩৫ সালের ১৯ আগস্ট ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার মজুপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

বাবা মাওলানা মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহর কর্মসূত্রে কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসার অ্যাংলো-পার্সিয়ান বিভাগে পড়াশোনা শুরু করেন তিনি। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর পরিবারের সঙ্গে ঢাকায় চলে আসেন। ১৯৫৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে সাহিত্য ও সাংবাদিকতায় পুরোপুরি আত্মনিয়োগ করেন।

সাংবাদিক হিসেবে ‘যুগের আলো’ পত্রিকার মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করেন জহির রায়হান। পরবর্তীতে ‘খাপছাড়া’, ‘যান্ত্রিক’, ‘সিনেমা’ এবং ‘প্রবাহ’ পত্রিকার সঙ্গে বিভিন্নভাবে যুক্ত ছিলেন। ১৯৫৫ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘সূর্যগ্রহণ’। এরপর ‘শেষ বিকেলের মেয়ে’, ‘আরেক ফাল্গুন’ ও ‘হাজার বছর ধরে’র মতো কালজয়ী সাহিত্যকর্ম উপহার দেন তিনি। ‘হাজার বছর ধরে’ উপন্যাসের জন্য ১৯৬৪ সালে অর্জন করেন আদমজী সাহিত্য পুরস্কার।

চলচ্চিত্রে নতুন দিগন্ত

১৯৫৭ সালে ‘জাগো হুয়া সাভেরা’ চলচ্চিত্রে সহকারী হিসেবে রুপালি জগতে যাত্রা শুরু করেন জহির রায়হান। ১৯৬১ সালে ‘কখনো আসেনি’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। এরপর একের পর এক চলচ্চিত্র নির্মাণ করে বাংলা সিনেমায় নতুন ধারার সূচনা করেন তিনি।

১৯৬৪ সালে পাকিস্তানের প্রথম উর্দু রঙিন চলচ্চিত্র ‘সঙ্গম’ এবং পরের বছর প্রথম সিনেমাস্কোপ চলচ্চিত্র ‘বাহানা’ নির্মাণ করেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে ‘বেহুলা’, ‘কাঁচের দেয়াল’ ও ‘আনোয়ারা’।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়া জহির রায়হানের ওপর একুশের চেতনার গভীর প্রভাব ছিল। সেই চেতনারই শক্তিশালী বহিঃপ্রকাশ ঘটে তাঁর কালজয়ী চলচ্চিত্র ‘জীবন থেকে নেয়া’-তে।

মুক্তিযুদ্ধের সময় কলকাতায় গিয়ে চলচ্চিত্রটি প্রদর্শন করেন তিনি। সেখানে সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন ও ঋত্বিক ঘটকের মতো বরেণ্য নির্মাতারাও উপস্থিত ছিলেন। চলচ্চিত্রটি ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করে।

মুক্তিযুদ্ধের ওপর নির্মিত তাঁর ঐতিহাসিক প্রামাণ্যচিত্র ‘স্টপ জেনোসাইড’ বিশ্ববিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছিল। চলচ্চিত্রটির প্রদর্শনী থেকে পাওয়া অর্থ তিনি মুক্তিযোদ্ধা তহবিলে দান করেন।

অন্তর্ধান ও অমর স্মৃতি

স্বাধীনতার পর ১৯৭১ সালের ১৭ ডিসেম্বর ঢাকায় ফেরেন জহির রায়হান। এরপর তিনি বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের খুঁজে বের করা এবং হত্যাকাণ্ডের তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহে উদ্যোগী হন। গঠিত হয় বুদ্ধিজীবী হত্যা তদন্ত কমিটি।

জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি ঘোষণা করেছিলেন, বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের পেছনের মূল ষড়যন্ত্রকারীদের মুখোশ উন্মোচন করবেন। কিন্তু সেই সত্য প্রকাশের সুযোগ আর পাননি তিনি।

১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি নিখোঁজ ভাই শহীদুল্লাহ কায়সারকে মিরপুরে আটকে রাখা হয়েছে—এমন খবর পেয়ে জহির রায়হান সেখানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ছোট ভাই জাকারিয়া হাবিব, শ্যালক বাবুল ও শাহরিয়ার কবিরসহ কয়েকজনের সঙ্গে তিনি মিরপুরের উদ্দেশে রওনা হন। নিরাপত্তার কারণে সেনাবাহিনী অন্যদের আটকে দিলেও জহির রায়হান সেনা ও পুলিশের বহরের সঙ্গে মিরপুর ১২ নম্বরের দিকে এগিয়ে যান।

এরপর মিরপুরের কালাপানি পানির ট্যাংকের কাছে তৎকালীন বিহারি ও পাকিস্তানি সৈন্যদের হামলার ঘটনায় তিনি নিখোঁজ হন। পরদিন ৩১ জানুয়ারি মিরপুর এলাকা মুক্ত হলেও তাঁর মরদেহ আর উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

তাঁর অন্তর্ধান ও মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দাবি ও মতামত উঠে এসেছে। পরিবারের ধারণা, রাতের অন্ধকারে তাঁর মরদেহ গুম করা হয়েছিল। আবার জহির রায়হান মুজিববাহিনীর হাতে নিহত হয়েছিলেন বলেও দাবি করেছিলেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক নির্মল সেন। তবে তাঁর অন্তর্ধানের প্রকৃত রহস্য আজও পুরোপুরি উদ্ঘাটিত হয়নি।

বাংলা সাহিত্য ও চলচ্চিত্রে জহির রায়হানের অবদান তাঁকে পরিণত করেছে এক অমর স্রষ্টায়। তাঁর সৃষ্টিকর্ম আজও ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, মানবতা ও শোষণের বিরুদ্ধে সংগ্রামের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ দলিল হয়ে আছে।