বালু লুটে বদলে যাচ্ছে নদীর মানচিত্র
লালমনিরহাট জেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া তিস্তা, ধরলা, সানিয়াজান ও ধলাই নদী থেকে বছরের পর বছর ধরে অপরিকল্পিত ও অবৈধভাবে বালু উত্তোলন চলছে। জেলার উত্তর দিকে ধরলা এবং দক্ষিণে তিস্তা প্রবাহিত, এই জেলায় নদীপথের মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ১৮০ কিলোমিটার। জেলার পাটগ্রাম, হাতীবান্ধা, কালীগঞ্জ, আদিতমারী ও সদর উপজেলার বিভিন্ন পয়েন্টে দিন-রাত ড্রেজার ও শ্যালো মেশিন বসিয়ে বালু তোলার উৎসব চলায় বদলে যাচ্ছে এলাকার ভৌগোলিক মানচিত্র, নদী হারাচ্ছে স্বাভাবিক রূপ এবং হারিয়ে যাচ্ছে উর্বর ফসলি জমি। নদী তীরবর্তী হাজার হাজার মানুষ এখন অস্তিত্ব সংকটে ভুগছেন।
নদী ও পরিবেশ গবেষকদের মতে, নদীর বার্ষিক পলি ও বালু পুনঃপূরণ (Sediment Budget), তলদেশের জরিপ, প্রবাহের গতি ও তীরের অবস্থা বিশ্লেষণ করেই উত্তোলনের সর্বজনীন বা নিরাপদ সীমা নির্ধারণ করা উচিত। কোনো এলাকায় বালু মজুত থাকলেই তা তুলে নেওয়া বৈজ্ঞানিকভাবে নিরাপদ নয়। একটি নির্ধারিত বালুমহাল থেকে বছরে পরিমিত বালু তোলা যেতে পারে যদি নদীর স্বাভাবিক পলি প্রবাহ তা পূরণ করতে পারে। তিস্তার মতো মধ্যম মাত্রার বালুময় নদী থেকে পরিবেশের ক্ষতি না করে নির্দিষ্ট সার্ভে সাপেক্ষে বছরে সর্বোচ্চ ৫ লাখ থেকে ৭ লাখ ঘনমিটার বালু অপসারণ করা সম্ভব হলেও বাস্তবে প্রতি বছর গড়ে ২০ থেকে ২৫ লাখ ঘনমিটারের বেশি বালু তোলা হচ্ছে, যা নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে ৫ থেকে ১০ গুণ বেশি।
অন্যদিকে, আবাদি জমির তলদেশ থেকে সর্বোচ্চ ২ থেকে ৩ ফুটের বেশি গভীরে বালু তোলা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হলেও লালমনিরহাটে ১০ থেকে ২০ ফুট গভীর করে বালু তোলা হচ্ছে। নদী থেকে যথেচ্ছ বালু তোলায় তলদেশে গভীর গর্তের সৃষ্টি হয়ে বর্ষাকালে পানির প্রবাহের দিক পরিবর্তিত হয় এবং স্বাভাবিক পলল স্তরের বিনাশ ঘটে।
লালমনিরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ডের এক নির্বাহী প্রকৌশলীর মতে, নদীর তীর থেকে ৪০০ থেকে ৫০০ মিটার দূরত্বে বালু তোলা হলে ক্ষতি কম হয়, কিন্তু তীর থেকে মাত্র ২০-৩০ মিটার দূরত্বে বালু তুললে পানির ঘূর্ণিস্রোত সরাসরি তীরে আঘাত হানে এবং তীব্র ভাঙন সৃষ্টি করে। বালুমহাল আইন অনুযায়ী ইজারার সীমানা ও নদীর ঢাল অক্ষত রেখে বালু তোলার নিয়ম থাকলেও বাস্তবে তা মানা হচ্ছে না। এছাড়া কৃষি জমি বা সংলগ্ন নদী থেকে ড্রেজিং করায় পাশের উর্বর জমির তলার মাটি সরে গিয়ে ধসে পড়ছে, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর অস্বাভাবিক নিচে নেমে যাচ্ছে এবং ধান, তামাক ও ভুট্টা চাষের জমি নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে।
একই ধরণের ভূ-প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের চিত্র উঠে এসেছে অন্যান্য গবেষণাতেও। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় মেঘনা নদীতে এবং ২০২৬ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় সোমেশ্বরী নদীতে ২০২০–২০২৩ সময়ে অতিরিক্ত বালু উত্তোলনের ফলে ৩১ হেক্টর ভূমি ক্ষয়, নদীর চ্যানেলে পরিবর্তন, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর হ্রাস ও জীববৈচিত্র্য বিনাশের প্রমাণ মিলেছে।
নদী ও কৃষির এই ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন গবেষক ও ক্ষতিগ্রস্ত স্থানীয় অধিবাসীরা। তিস্তা নদী বাঁচাও আন্দোলনের নদী গবেষক মো. সাজ্জাদ হোসেন বলেন, “নদীর বুক থেকে অনিয়ন্ত্রিত বালু উত্তোলন নদীকে পুনর্গঠন হতে দেয় না। একটি নদী তার স্বাভাবিক পলি দিয়ে যে তলদেশ তৈরি করে, তা কেটে ফেললে পানির গতিবেগ পারের দিকে ধাক্কা দেয়। লালমনিরহাটে তিস্তার ভাঙন বৃদ্ধির মূল কারণই হলো অপ্রাতিষ্ঠানিক ও অবৈধ বালু ড্রেজিং।”
কালীগঞ্জ উপজেলার মহিষখোচা এলাকার তিস্তাপারের বাসিন্দা আকবর আলী (৫৫) বলেন, “আগে নদী ভাঙলে এক পাশে ভাঙত, অন্য পাশে চর জাগত। এখন চারপাশ দিয়ে ড্রেজার দিয়ে বালু তোলায় নদী কোন দিক দিয়ে ভাঙবে কেউ বলতে পারে না। রাতে ঘুমাতে পারি না, কখন যে বাড়িঘর সব নদীতে চলে যায়।”
পাটগ্রাম উপজেলার ধলাই নদী সংলগ্ন এলাকার কৃষক রফিকুল ইসলাম তাঁর করুণ অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে বলেন, “নদীর কোল ঘেঁষে আমার দুই বিঘা ভুট্টা ও ধানের জমি ছিল। নদীর ভেতরের থেকে দিন-রাত বালু তোলার কারণে আমার পুরো জমি তলে গেছে। বালু তোলার গর্তে ধসে পড়ে পুরো জমি এখন নদী হয়ে গেছে। আমরা তো নিঃস্ব হয়ে গেলাম।”
বিষয়টি নিয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে লালমনিরহাট জেলা প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, “জেলায় অবৈধভাবে বালু ও পাথর উত্তোলনের বিরুদ্ধে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে। যে স্থানে ইজারা নেই, সেখান থেকে বালু তোলা সম্পূর্ণ বেআইনি। নদী ও ফসলি জমি রক্ষায় জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হয়েছে এবং বেশ কিছু ড্রেজার জব্দ ও জরিমানা করা হয়েছে।”
পাউবোর তথ্য মতে, তিস্তা একটি খরস্রোতা পাহাড়ি নদী হওয়ায় এমনিতেই প্রচুর পলি বহন করে এবং গতিপথ পরিবর্তন করে ভাঙন ঘটায়। সংস্থাটি তিস্তার বাম তীর রক্ষায় ৯.২৫ কিলোমিটার তীর সংরক্ষণ এবং ধরলা নদীর তীর সংরক্ষণ ও খনন করে বিভিন্ন স্থাপনা রক্ষা করেছে। তাই এই ভারসাম্য বজায় রাখতে বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইনের সঠিক প্রয়োগ জরুরি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু ইজারা ও রাজস্বের হিসাব না করে প্রতি বছর বাথাইমেট্রিক সার্ভে (Bathymetric survey), সেডিমেন্ট-বাজেট অ্যাসেসমেন্ট এবং জিপিএস বা স্যাটেলাইটের মাধ্যমে নদীর পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করে সে সম্পর্কিত তথ্য প্রকাশ্যে আনা প্রয়োজন। বৈজ্ঞানিক জরিপ ও কঠোর আইনি তদারকি ছাড়া অপরিকল্পিত বালু উত্তোলন বন্ধ না হলে লালমনিরহাটের কৃষিজমি ও নদীব্যবস্থা স্থায়ী মরুময়তার মুখে পড়বে।



























