গবেষণার টাকা নিয়েও প্রতিবেদন জমা দেননি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৫৮ শিক্ষক
বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) অর্থায়নে পরিচালিত গবেষণা প্রকল্পের চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা না দেয়ার প্রবণতা উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে।
পাঁচ অর্থবছরে অনুমোদিত দেড় শতাধিক গবেষণা প্রকল্পের চূড়ান্ত প্রতিবেদন এখনো জমা পড়েনি। এতে সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত গবেষণার জবাবদিহি, অর্থের যথাযথ ব্যবহার এবং গবেষণা কার্যক্রমের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা প্রশাসনসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত ইউজিসির অর্থায়নে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে মোট ৪৮২টি গবেষণা প্রকল্প অনুমোদন দেয়া হয়। এর মধ্যে ১৫৮ প্রকল্পের চূড়ান্ত প্রতিবেদন এখনো জমা পড়েনি। অর্থাৎ প্রতি তিন প্রকল্পের প্রায় একটির প্রতিবেদন অনিষ্পন্ন।
বিষয়টিকে আরো বিতর্কিত করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অবস্থান। নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও যেসব শিক্ষক গবেষণার চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেননি, তাদের নাম প্রকাশে অনাগ্রহ দেখিয়েছে প্রশাসন। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক অভিযোগ করেছেন, প্রতিবেদন জমা না দেয়া গবেষকদের তালিকায় বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ও সাবেক উপাচার্য, উচ্চ পদে দায়িত্ব পালনকারী শিক্ষক এবং প্রভাবশালী শিক্ষাবিদদের নাম থাকায় তা প্রকাশ করা হচ্ছে না। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে প্রশাসনের আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
গবেষণাসংশ্লিষ্ট একাধিক শিক্ষক ও গবেষকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ইউজিসির অর্থায়নে পরিচালিত একটি গবেষণা প্রকল্পের মেয়াদ সাধারণত এক বছর। এ সময়ের মধ্যে গবেষণা সম্পন্ন করে চূড়ান্ত প্রতিবেদন বিশ্ববিদ্যালয়ে জমা দেয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা সম্ভব না হলে গবেষককে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে সময় বৃদ্ধির আবেদন করতে হয়। সে অনুযায়ী বাড়তি সময়ের মধ্যে গবেষণা সম্পন্ন করে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়া বাধ্যতামূলক।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা না পড়লে গবেষণার উদ্দেশ্য ও ফলাফল মূল্যায়ন করা যায় না। একই সঙ্গে বরাদ্দ অর্থ যথাযথভাবে ব্যয় হয়েছে কিনা, গবেষণা থেকে নতুন জ্ঞান বা নীতিনির্ধারণে কোনো অবদান এসেছে কিনা—এসব বিষয়ও অজানা থেকে যায়। এতে সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত গবেষণার কার্যকারিতা ও সুশাসন নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি হয়।
যেসব শিক্ষক গবেষণার টাকা নিয়ে প্রতিবেদন দেননি তাদের আইনের আওতায় আনা দরকার বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মজিবুর রহমান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘গবেষণার জন্য সরকারি কোষাগারের টাকা নিয়ে রিপোর্ট জমা না দেয়া অপরাধ। যেসব শিক্ষক রিপোর্ট জমা দেননি তাদের অবশ্যই আইনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে।’
অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান আরো বলেন, ‘অনেক শিক্ষক গবেষণার চেয়ে প্রশাসনিক পদ ও পদবির প্রতি বেশি আগ্রহী হয়ে ওঠেন। এর ফলে উপাচার্য বা উপ-উপাচার্যের মতো দায়িত্ব পাওয়ার প্রতিযোগিতা গবেষণার চর্চাকে ছাপিয়ে যায়।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২০-২১ থেকে ২০২২-২৩ অর্থবছর পর্যন্ত প্রকল্পের সংখ্যা তুলনামূলক কম থাকলেও পরবর্তী দুই অর্থবছরে গবেষণা অনুদানের পরিমাণ ও প্রকল্প সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। এ সময়ে একটি গবেষণা প্রকল্পে সর্বনিম্ন সাড়ে ৩ লাখ এবং সর্বোচ্চ প্রায় ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। কিন্তু সে অর্থে কী গবেষণা হয়েছে, তার কোনো প্রতিবেদনই জমা দেননি ১৫৮ শিক্ষক।
তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯ অনুযায়ী এসব গবেষণা প্রকল্পের তথ্য জানতে গত ১৮ জুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ পরিচালকের কাছে আবেদন করা হয়। তাতে গত পাঁচ অর্থবছরে ইউজিসির অর্থায়নে কতজন শিক্ষক গবেষণা অনুদান পেয়েছেন, কতজন চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন এবং যারা জমা দেননি তাদের নাম ও বিভাগের তালিকা চাওয়া হয়। আইন অনুযায়ী, ২০ কার্যদিবসের মধ্যে তথ্য দেয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পরও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। পরে জনসংযোগ, রেজিস্ট্রার অফিস, হিসাব পরিচালকসহ একাধিক দপ্তরে যোগাযোগ করে জানা যায়, আবেদনটি বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরছে। একপর্যায়ে অনুসন্ধানে জানা যায়, কোষাধ্যক্ষের দপ্তরে আটকে রয়েছে আবেদনটি। দুইদিন পর কোষাধ্যক্ষের দপ্তরে গিয়ে আবেদন-সংক্রান্ত নথিতে দেখা যায়, শিক্ষকদের নাম প্রকাশ না করে শুধু সংখ্যা দেয়ার অনুমোদন মিলেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. এম জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘যেসব তথ্য দেয়ার অনুমতি রয়েছে, সেগুলোই দেয়া হয়েছে। যেসব তথ্যের অনুমতি দেয়া হয়নি, সেগুলো দেয়া হবে না। শিক্ষকদের নাম প্রকাশের অনুমতি দেয়া হয়নি।’
বিষয়টি উপাচার্য ড. এবিএম ওবায়দুল ইসলামের নজরে আনা হলে তিনি পুনরায় আবেদন করার পরামর্শ দেন। সে অনুযায়ী গত ২২ জুলাই নতুন করে আবেদন করা হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের নামের তালিকা পাওয়া যায়নি।
জানতে চাইলে উপাচার্য অধ্যাপক ড. ওবায়দুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০০৯ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত গবেষণা তহবিলের বরাদ্দ, অর্থের ব্যবহার, চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা এবং জবাবদিহির পুরো বিষয়টি পর্যালোচনার জন্য পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। অতীতে অনেক গবেষণা প্রকল্পে অর্থ বরাদ্দ দেয়া হলেও কিছুর চূড়ান্ত প্রতিবেদন ও প্রয়োজনীয় আর্থিক নথিপত্র পাওয়া যাচ্ছে না। এসব বিষয় স্বচ্ছভাবে যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার লক্ষ্যেই এ তদন্ত পরিচালিত হবে।’
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন থেকে পাওয়া তথ্য মতে, ২০২০-২১ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত ইউজিসির অর্থায়নে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট ৪৮২টি গবেষণা প্রকল্প অনুমোদন পায়। এর মধ্যে ৩২৪ প্রকল্পের চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা পড়েছে। বাকি ১৫৮ প্রকল্পের প্রতিবেদন এখনো জমা হয়নি, যা মোট অনুমোদিত প্রকল্পের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। টাকার অংকের পরিমাণ প্রায় ৫ কোটি টাকা। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে অনুমোদন দেয়া হয়েছে ৯৮টি গবেষণা প্রকল্প।
বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক মনে করছেন, প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও দীর্ঘদিন চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা না পড়া গবেষণা কার্যক্রমের স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং সরকারি অর্থের কার্যকর ব্যবহারের বিষয়ে গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। এর ফলে ভবিষ্যতে গবেষণা অনুদান অনুমোদন ও নতুন প্রকল্প মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও জটিলতা তৈরি হয়। যদিও ইউজিসির নীতিমালায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা গবেষকের বাধ্যতামূলক দায়িত্ব হিসেবে উল্লেখ রয়েছে।
ইউজিসির রিসার্চ গ্রান্টস অ্যান্ড অ্যাওয়ার্ড ডিভিশনের পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. ওমর ফারুখ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘একটি গবেষণা প্রকল্পের নির্ধারিত মেয়াদ সাধারণত এক বছর। তবে বিভিন্ন কারণে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিতে অনেক ক্ষেত্রে এর চেয়েও বেশি সময় লাগে। কোনো শিক্ষক নির্ধারিত সময়ে গবেষণা সম্পন্ন করতে না পারলে বা প্রকল্প শেষ করতে ব্যর্থ হলে সেক্ষেত্রে অর্থ ফেরতের একটি বিধিবদ্ধ প্রক্রিয়া রয়েছে। সংশ্লিষ্ট নিয়ম অনুসারেই বিষয়টি নিষ্পত্তি করা হয়।’

























